গল্প: বুদ্ধির পাহাড়, কাজের শূন্য
শহরের এক কোণে বাস করত ৩৫ জন মানুষ।
তাদের কেউ সরকারি চাকরিজীবী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ দিনমজুর—
সবাইয়ের মাঝে একটি মিল ছিল:
নিজেদের বুদ্ধি নিয়ে প্রত্যেকের গর্ব,
কিন্তু কাজ?—আহা! সেটা অগত্যা অন্য কেউ করুক।
একদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল—
“আমরা একটা সমিতি করবো। অবসর সময়ে কিছু করি।
সময় নষ্ট না করে একটু উপকারের কাজ করি।”
সকলেই রাজি।
কাগজে-কলমে সভাপতি, সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ—
সব ঠিক হলো ঝড়ের গতিতে।
কারণ এ জিনিসে বুদ্ধি লাগে, ঘাম নয়।
এরপর সবাই বসল সমিতির প্রথম কাজ ঠিক করতে।
অনেকে বলল, “মাছ ধরা ভালো, সহজ, লাভও হবে।”
সিদ্ধান্ত হলো—মাছ ধরা হবে।
এবার পুকুর খোঁজা।
শহরের বাইরে একটা বড় পুকুর পাওয়া গেল।
পানি শান্ত, ঢেউ নেই, মাছের ছায়া-ছায়া দেখা যায়।
সবাই বলল—“এটাই ঠিক!”
কিন্তু পুকুরের ধারে দাঁড়াতেই শুরু হলো বুদ্ধির ঝড়।
“ভাই, মাছের রংটা যদি গোলাপি হয়!
গেলে তো আমরা সোনালী দামে বিক্রি করতে পারবো।”
“না না, লাল হবে!
বিদেশে লাল মাছের চাহিদা বেশি। আর আমরা তো আন্তর্জাতিক ব্যবসা করবো!”
“স্বাদ হবে এমন—জিভে দিলে যেন তাৎক্ষণিক চোখে পানি এসে যায়…
খেয়ে কেউ ভুলতে না পারে!”
এবার আরেকজন বলল—
“আমরা আগে মাছের ব্রান্ড নাম ঠিক করি।
‘Premium Royal Golden Fish’—
শুনলেই মানুষ কিনবে!”
এমন কথা শুনে আরেকজন মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলল—
“ধৈর্য ধরুন!
আমরা তো এখনও মাছ ধরিনি।
প্রথমে মাছ ধরার জাল কিনি, তারপর পানি…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সামনে থেকে প্রতিবাদ—
“জাল কেনার আগে আমরা মাছের market value বুঝব না?
আর market value বুঝার আগে মাছের ধরন বুঝবো না?”
তারপর শুরু হলো ব্রেনস্টর্মিং মিটিং।
মাছ কী খাবেন, কতদিন বাঁচবে,
ফ্রিজে কতদিন থাকবে,
কোন জেলায় কত দামে বিক্রি হবে—
এমনকি মাছের জন্য ফেসবুক পেজ নামও ঠিক হয়ে গেল!
সবচেয়ে মজার কথা—
একজনও পুকুরের পানিতে পা দিল না।
সবার চোখের সামনে ছিল মাছের স্বপ্ন,
কিন্তু হাতে ছিল শুধু মোবাইল ও কাগজ।
মাসের পর মাস পরিকল্পনা।
কেউ প্রেজেন্টেশন বানাচ্ছে,
কেউ লোগো আঁকছে,
কেউ নতুন গ্রুপ তৈরি করছে—
শুধু মাছ ধরার কাজটা কেউ করছে না।
একদিন সেই ৩৫ জনের মধ্যে
একজন চুপচাপ লোক উঠে দাঁড়াল।
লোকটা নিজের কথাতেই বলত—
“আমার বুদ্ধি কম, বেশি কিছু বুঝি না।
কিন্তু মাছ ধরতে হলে
পানিতে নামতেই হবে।”
সে কারও কথায় কান দিল না।
জাল হাতে নিয়ে পুকুরে নামল।
পানি ঠাণ্ডা, হাঁটু কাঁপছে—
পাড়ে দাঁড়িয়ে ৩৫ জন হাসাহাসি করছে।
কিন্তু একটু পর
জাল টানটান হয়ে উঠল,
শব্দ হলো ঝুপ!
সে একটুখানি মাছ তুলে আনল।
মাছ ছোট, না খুব সুন্দর,
না খুব দামি।
কিন্তু সেটি বাস্তব।
পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা
সব বিদ্যাবুদ্ধি-গুরুদের মুখ শুকিয়ে গেল।
ব্রান্ড, দাম, রং, পোস্টার—
সব যেন এক মুহূর্তে বাতাস হয়ে গেল।
তখন সেই “কম বুদ্ধি”র মানুষটি আস্তে বলল:
“বড় মাছের স্বপ্ন বাড়িতে বসে পাওয়া যায় না।
পানিতে নামতে হয়।
হাত ভিজাতে হয়।
কখনও ছোট মাছ থেকেই শুরু করতে হয়।”
৩৫ জন চুপ।
তাদের সব বড় বক্তৃতা,
বড় পরিকল্পনা
পুকুরের একটুখানি জলের নিচে চাপা পড়ে গেল।
গল্পের শিক্ষা
যে শুধু মাছের আকার, রং এবং স্বাদ নিয়ে কথা বলে
সে স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু যে পানিতে নামে—
সে মাছ পায়।
