গল্পের নাম: মজিদ সাহেবের ‘মেগা প্রজেক্ট’ ও চিনি ছাড়া রং চা
বিকেল ৫টা। রমনা পার্কের বেঞ্চে বা কোনো এক ড্রইং রুমে আপনাদের ‘রিটায়ার্ড কিন্তু টায়ার্ড নই’ গ্রুপের মাসিক মিটিং চলছে। উপস্থিত ৫ জন। এজেন্ডা: জমি কেনা হবে, অনলাইনে ব্যবসা হবে, এবং আগামী ৫ বছরে এই গ্রুপ দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক গ্রুপ হবে।
সভাপতি রফিক সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “বন্ধুরা, আজ আর কোনো কথা নয়। আজ অ্যাকশন! আমরা যে ১০ কাঠা জমিটা দেখব বলেছিলাম, সেটার কী খবর?”
কোষাধক্ষ্য সালাম সাহেব পকেট থেকে চশমা বের করতে করতে বললেন, “জমির খবর তো ভালো। কিন্তু ভাই, আমার সুগারটা আজ ১২। গতকাল নাতির জন্মদিন ছিল, একটু কেক খেয়ে ফেলেছিলাম। আচ্ছা, জমিতে কি যাতায়াতের রাস্তা আছে? নাকি আমার মতো হাঁটুর ব্যথার রোগীকে হেলিকপ্টারে যেতে হবে?”
টেকনিক্যাল ডিরেক্টর (স্বঘোষিত) জামান সাহেব স্মার্টফোনের ফ্লাশলাইট ভুল করে জ্বালিয়ে ফেলে বললেন, “রাস্তা কোনো ব্যাপার না। আমি গুগল ম্যাপে দেখেছি। তবে সমস্যা হলো, আমি অনলাইনে ‘হালাল ইনভেস্টমেন্ট’ নিয়ে একটা পেজ খুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভুল করে আমার বিড়ালের ছবি আপলোড হয়ে গেছে। এখন সবাই বিড়ালের দাম জানতে চাচ্ছে। অনলাইনে ব্যবসা করা খুব রিস্কি ভাই!”
সবচেয়ে নীরব সদস্য, কাশেম ভাই হঠাৎ বলে উঠলেন, “শোনো, জমি কেনা বা অনলাইন ব্যবসা—সব হবে। কিন্তু আসল সমস্যা হলো, আমরা প্ল্যান করি জুম (Zoom) মিটিং-এ, আর ঝগড়া করি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। কাজের কাজ কিছুই হয় না। গত তিন মাসে আমাদের একমাত্র অর্জন হলো—আমরা সবাই এখন জানি কার কোন ব্র্যান্ডের প্রেসারের ওষুধ লাগে!”
সবাই চুপ। পরিবেশটা একটু থমথমে হয়ে গেল। তখন রফিক সাহেব হেসে বললেন, “দেখো বন্ধুরা, আমরা রিটায়ার্ড করেছি অফিস থেকে, জীবন থেকে নয়। আমাদের হাতে এখন অফুরন্ত সময়। আমরা যদি এখনই কিছু না করি, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বলবে—’দাদারা শুধু চা-ই খেয়ে গেলেন, জমি আর কিনলেন না’।”
তিনি আরও বললেন, “বিনিয়োগ মানে শুধু টাকা খাটানো নয়, বিনিয়োগ মানে আমাদের এই বন্ধুত্বটাকে টিকিয়ে রাখা। লাভ হলে সবাই মিলে সিঙ্গাপুর যাব, আর লস হলে? সবাই মিলে এই পার্কেই বাদাম খাব। কিন্তু কিছু একটা তো করব!”
সালাম সাহেব চশমা ঠিক করতে করতে বললেন, “ঠিক আছে! তাহলে কালই আমি জমির বায়না করার ব্যবস্থা করছি। আর জামান, তুমি বিড়ালের ছবি ডিলিট করে জমির ছবি দাও। চলো, আজ চিনি ছাড়া চা দিয়েই আমাদের ‘মেগা প্রজেক্ট’-এর টোস্ট হোক!”
গল্পের সারকথা (মোটিভেশন)
গল্পটি কাল্পনিক হলেও এর বাস্তবতা হলো—‘অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার ভয় থাকে (Analysis Paralysis)।’
অবসর জীবনের এই উদ্যোগ সফল করতে হলে আপনাদের যা মনে রাখতে হবে: ১. পারফেকশনের অপেক্ষা নয়: সব পরিস্থিতি অনুকূলে আসার জন্য অপেক্ষা করবেন না। ছোট কোনো প্রজেক্ট দিয়ে শুরু করুন। ২. ভুল করার আনন্দ: এখন আর বসের ঝাড়ি খাওয়ার ভয় নেই। ছোটখাটো ভুল হলে সেটা নিয়ে হাসাহাসি করুন, কিন্তু থেমে থাকবেন না। ৩. সামাজিক দায়বদ্ধতা: শুধু মুনাফা নয়, আপনারা এমন কিছু করুন যেন সমাজের মানুষ আপনাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়।
আপনাদের উদ্যোগকে গতিশীল করতে আমার কিছু পরামর্শ
গল্পের পাশাপাশি প্র্যাকটিক্যাল কিছু পদক্ষেপ নিলে আপনাদের গ্রুপটি দ্রুত এগিয়ে যাবে:
- একটি ‘কনস্টিটিউশন’ বা রূপরেখা তৈরি করুন: মৌখিক কথার চেয়ে লিখিত দলিল সম্পর্ক ভালো রাখে। কে কত টাকা দেবেন, লভ্যাংশ কীভাবে ভাগ হবে, এবং কেউ মাঝপথে চলে যেতে চাইলে নিয়ম কী হবে—তা এখনই ঠিক করে নিন।
- দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ: যিনি প্রযুক্তি ভালো বোঝেন তাকে অনলাইনের দায়িত্ব দিন, যিনি ভালো দরদাম করতে পারেন তাকে জমি বা ডেভলপমেন্টের দায়িত্ব দিন।
- ‘ফান ফান্ড’ গঠন: ব্যবসার টাকার বাইরেও একটা ছোট ফান্ড রাখুন শুধু খাওয়া-দাওয়া বা ভ্রমণের জন্য, যাতে ব্যবসায়িক টেনশন বন্ধুত্বের ক্ষতি না করে।
